ইন্টারনেট ও বাংলাদেশ

এর আগের পোস্টে আমরা দেখেছি ইন্টারনেটের একেবারে শুরুর দিকের ইতিহাস। ইন্টারনেট ব্যবহার করতে গিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে যে এই ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবস্থা আসলে কীভাবে কাজ করে ও কীভাবে এর রক্ষণাবেক্ষন করা হয়। ইন্টারনেট মূলত দাড়িয়ে আছে বিশ্বব্যাপি এক ব্যাকবোন বা মেরুদন্ডের উপরে। ইন্টারনেটে সংযুক্ত হওয়ার মানে হচ্ছে এই ব্যাকবোনের সাথে সংযুক্ত হওয়া। বিভিন্ন দেশ মিলে বড় বড় অপটিকাল ফাইবার কেবল ব্যবহার করে নেটওয়ার্ক তৈরী করে বিভিন্ন আইএসপি (ISP = Internet Service Provider) কে সংযোগ দেয়। এই আইএসপি প্রতিষ্ঠানগুলো আবার বিভিন্ন বিভাগ, জেলা ও শহরগুলোতে নেটওয়ার্ক স্থাপন করে। সেখান থেকে কখনো সরাসরি আবার কখনো স্থানীয় আইএসপি এর মাধ্যমে গ্রাহকের কাছে ইন্টারনেট সংযোগ পৌছে দেয়। এভাবেই আমরা ইন্টারনেটে সংযুক্ত হতে পারি।

১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট ভিত্তিক (VSAT) তথ্য আদানপ্রদানের সুযোগ চালু করে। তখন বাংলাদেশ তার ও টেলিফোন বোর্ড (BTTB) দুটি আইএসপি প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেয় ইন্টারনেট সার্ভিস দেবার জন্য। সেই সময়ই বাংলাদেশ ইন্টারনেটের সাথে সংযুক্ত হয়। ধীরে ধীরে আইএসপি এর সংখ্যা বাড়তে থাকে। ২০০৫ সাল নাগাদ দেশে প্রায় ১৮০ টি আইএসপি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে যারা ইন্টারনেট সার্ভিস দিতে থাকে। তখনকার সময় ইন্টারনেট ছিল মূলত ডায়াল-আপ ভিত্তিক, অর্থাৎ, কেবল টেলিফোন বা পিএসটিএন ল্যান্ডফোন দিয়ে আইএসপি এর নম্বরে ডায়াল করে ইন্টারনেটে সংযুক্ত হতে হতো। ২০০৬ সালে বাংলাদেশ কক্সবাজারে SEA-ME-WE 4 সাবমেরিন কেবলের সাথে সংযুক্ত হয়। এই সাবমেরিন কেবলটি নিয়ন্ত্রন ও রক্ষনাবেক্ষন করে ১৬ টি টেলিকমিউনিকেশন প্রতিষ্ঠানের একটি কনসোর্টিয়াম। এদের মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানী লিমিটেড (Bangladesh Submarine Cable Company Limited, BSCCL)। এই কেবলের সর্বমোট তথ্য আদানপ্রদানের ক্ষমতা হচ্ছে 4600Gbit/s। এই কেবলটির সম্পূর্ণ দৈর্ঘ্য প্রায় ২০,০০০ কিলোমিটার এবং এর মোট ১৭টি ল্যান্ডিং পয়েন্ট রয়েছে সিঙ্গাপুর, মালয়শিয়া, থাইল্যান্ড, বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, সংযুক্ত আরব-আমিরাত, সৌদি আরব, মিশর, তিউনিশিয়া, ইতালি, আলজেরিয়া ও ফ্রান্স দেশগুলোতে।

আমরা ব্যক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে এই আইএসপি, মোবাইল অপারেটর ও ওয়াইম্যাক্স সার্ভিস প্রোভাইডার প্রতিষ্ঠান থেকে বাসা-বাড়িতে ও অফিস-আদালতে ইন্টারনেট সংযোগ নেই। আইএসপি, ওয়াইম্যাক্স ইত্যাদি সার্ভিস প্রোভাইডার প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (BTRC) এর কাছ থেকে অনুমোদন বা লাইসেন্স ক্রয় করে। তারা দুটি উপায়ে ইন্টারনেটে তথ্য আদান প্রদান করে। এর একটি হচ্ছে ন্যাশনাল ইন্টারনেট এক্সচেঞ্জ (National Internet Exchange) বা নিক্স (NIX) আর অন্যটি হচ্ছে ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে (International Internet Gateway) বা আইআইজি (IIG)।

নিক্সের মাধ্যমে আভ্যন্তরীন বা ডমেস্টিক ইন্টারনেটে চাহিদা পূরণ করা হয়। যেমন, আমি যদি খুলনায় বসে ঢাকার কোনো সার্ভার থেকে তথ্য নিতে চাই, তবে সেটা নিক্স ব্যবহার করবে। ২০০৪ সালে নিক্সের অধীনে দুটি এক্সচেঞ্জ পয়েন্ট বসানো হয়। ২০১৪ সালে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন বা বিটিআরসি নিক্স লাইসেন্স উন্মুক্ত করে দেয় এবং বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানকে নিক্স লাইসেন্স দেয়।

আর কক্সবাজারস্থ সাবমেরিন কেবল গেটওয়া ব্যবহার করে বৈশ্বিক ইন্টারনেটের জন্য ব্যবহার করা হয় আইআইজি। অর্থাৎ, দেশের সমস্ত ইন্টারনেট ব্যবহারকারী কোনো না কোনো আইএসপির সাথে সংযুক্ত হন। আবার বিভিন্ন ডেটা প্রোভাইডার প্রতিষ্ঠান দেশের বড় বড় বিভাগীয় শহর ও জেলা শহর পর্যন্ত কেবল নেটওয়ার্ক বসায়। আইএসপিগুলো এই কেবল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে আইআইজি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে তথ্য পাঠায়। আইআইজি প্রতিষ্ঠানগুলো তখন সেই তথ্য সাবমেরিন কেবল ব্যবহার করে বহির্বিশ্বস্থ বিভিন্ন গন্তব্য নেটওয়ার্কের উদ্দেশ্যে ইন্টারনেটে পাঠায় এবং একইভাবে বহির্বিশ্বস্থ নেটওয়ার্কসমূহ থেকে প্রাপ্ত ডেটা দেশের আভ্যন্তরীন নেটওয়ার্কের মধ্য দিয়ে যথাযথ প্রাপক আভ্যন্তরীণ আইএসপিসমূহের কাছে পাঠায়। আইএসপিগুলো আবার তখন সেই ডেটা যথাযথ ব্যবহারকারীর কাছে পাঠায়। বাংলাদেশে বর্তমানে দুটি আইআইজি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, একটি হচ্ছে ম্যাঙ্গো টেলিসার্ভিসেস লিমিটেড আর অন্যটি হচ্ছে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানী লিমিটেড (BTCL)।

এই হলো মোটামোটি বাংলাদেশের ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবস্থা। ২০১৫ সালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ২১০ টি আইএসপি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বিটিআরসি এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী রয়েছে প্রায় ছয় কোটি তেত্রিশ লক্ষ। যদিও এর প্রায় ছয় কোটি বা ৯৫ শতাংশই মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী। ব্রডব্যান্ড বা ওয়াইম্যাক্স ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ছত্রিশ লক্ষ।

অপারেটর সাবস্ক্রাইবার (মিলিয়ন)
মোবাইল ইন্টারনেট 59.658
ওয়াইম্যাক্স (WiMAX) 0.112
আইএসপি ও পিএসটিএন 3.520
সর্বমোট 63.290